1. admin@nagorikexpress.com : নাগরিক এক্সপ্রেস : Nagorik Express প্রশাসন
শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:০৩ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
চলে গেলেন জাতীয় অধ্যাপক ও মতলবের কৃতি সন্তান ড. রফিকুল ইসলাম ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতিকে অব্যাহতি মতলব উত্তর ও দক্ষিণে ইউপি নির্বাচনে ১১ নৌকা প্রার্থীর জয় বাসে হাফ ভাড়া শুধুমাত্র ঢাকার মধ্যে : শিক্ষার্থীদের যেসব শর্ত মানতে হবে ইউপি নির্বাচন: ভাঙ্গায় ১২ জয়ীর ১১ জনই নিক্সন চৌধুরীর অনুসারী। গফরগাঁওয়ে দুই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই প্রার্থীর মধ্যে মত বিনিময়। “মনোহরদীতে হাফ পাশের দাবীতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন” লৌহজংয়ে সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রাণনাশের হুমকি ডামুড্যায় উপজেলায় ২৯৭ টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা ইউপি নির্বাচনে সদস্য প্রার্থী আরিফ ছৈয়াল জনগণের কল্লাণে কাজ করতে চান 

গারো বিউটিশিয়ান মাধবীদের কথা ♦ পাওয়া না পাওয়ার যতো বেদনা

  • আপডেট সময় : সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২০
  • ৩০৬ সময় দেখা

♦ গারো বিউটিশিয়ান মাধবীদের কথা ♦ পাওয়া না পাওয়ার যতো বেদনা ♥
♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦
বিউটিশিয়ান মাধবী মাংসাং। মধুপুরের এক অাদিবাসী গারো তরুণী। যেন সবুজ কুঞ্জে চিরহরিৎ তরুলতা। এক লাস্যময়ী শিল্পী। বৈশাখে মুকুলিত মধুপুর অরণ্যে। সেখানেই সুঘ্রাণ ছড়িয়েছেন বছর কুড়ি । তারপর অরণ্য ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ইট-সুরকির নিস্প্রাণ শহরে। তাও ষোল বছর। জীবন থেকে খসে গেছে দিনপুঞ্জির অনেক হিসাব।

মাধবীরা মধুপুর বনে জন্মায়, বনেই বড় হয়। বনের সৌন্দর্য যৌবনকে করে অালাভোলা। বাইরের টলটলে ফিগার, উদাস করা চোখ, ভেতরে প্রমত্তা নদীর ভরাট যৌবন, যতোই প্রবাহমান হোক বাস্তবতা তাদেরকে নিষ্ঠুর শহরে ঠেলে দেয়। অার সেখানে শোষণ, বঞ্চনা অার লাঞ্জনার ক্রুরতায় তিলেতিলে হয়ে উঠে ঝরা পাতার মতো নিস্প্রাণ।

বলছিলাম, টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের অাদিবাসী গারো তন্বী মাধবী মাংসাং এর কথা। যার জন্ম শাল বনের জাঙ্গালীয়া গ্রামে। বাবা স্বর্গীয় সুধীর রিছিল, মাতা রিংমি মাংসাং।

ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে মাধবী মেঝো। গারো প্রথানুযায়ী, মা ছিলেন নকনা। তাই বাবা নকরম হিসাবে শ্বশুরবাড়ি অাসেন জামাই হয়ে।

মধুপুর বনাঞ্চলে যে বারোশ গারো তরুণী ( বেসরকারি সংস্থা সেডের সার্ভে অনুযায়ী ১১৮৯ জন) বিউটি পার্লারে কাজ করেন, এদেরই একজন মাধবী। যাদের উপাধি বিউটিশিয়ান।

মাধবী অার দশজন গারো বিউটিশিয়ানের মতো হলেও তার জীবন সংগ্রাম একটু অালাদা। তান, লয় ও সুরে ভিন্নতা।

নকনা হিসাবে মাতা রিংমি মাংসাং জঙ্গল ঘেরা জাঙ্গালিয়ায় যে সম্পত্তি পেয়েছিলেন, তার অধিকাংশেরই কোন বৈধ কাগজ বা দলিলপত্রাদি ছিলোনা।

যেমনটা অধিকাংশ গারোরই নেই বা থাকেনা। শুধুমাত্র উত্তরাধিকার বা ঐতিহ্যগতভাবে ভোগদখল। প্রচলিত বন অাইনে যার কোনোই স্বীকৃতি নেই এবং জবরদখলকারি হিসাবে যা চিত্রিত; তেমন কন্টকিত জমির বড়ো অংশ মাধবীদের হাতছাড়া হয়ে যায় নব্বয়ের দশকে, বন বিভাগের কৃত্তিম বনায়ন কালে।

উত্তরাধিকার সুত্রের, এমন ক্রাইটেরিয়ার জমিতে বন বিভাগ নতুন করে বনায়ন করলেও মাধবী পরিবারের কেউ- ই- সেই সামাজিক বনায়নের অংশীদারিত্ব পাননি।

অাট ভাইবোনের সংসার, যা রাবনের গোষ্ঠি বলে প্রতিভাত হয়, সেটি চালাতে হিমশিম খায় পরিবার। এর মধ্যে মা রিংমি মাংসাং অসুস্খ হয়ে পড়লে চিকিৎসা চালানো দূরহ হয়ে পড়ে। শুরু হয় জমি বন্ধকী।

এক বিঘা বন্ধকী দিলে দুই বিঘা দখল; বাঙ্গালী বাবুদের এমন মহাজনী ফাঁদে সরল গারোদের নিঃস্ব করার যে চিরায়ত কৌশল, সেটির জালে বন্দী হয় মাধবীর পরিবার। হারাতে হারাতে টিকে থাকে শুধু বসত ভিটে।

এমন টানাপোড়নে বন্ধ হয়ে যায়, মাধবীসহ সকল ভাইবোনের পড়ালেখা। বেকার ভাইয়েরা মহাজনের খেতখামারে দিনমজুরীতে লাগে। নিজের হারানো জমিতেই দিনমজুরী। পরিবারের এমন দুর্দিনে তিন ভাই মৃণাল মাংসাং, রঞ্জণ মাংসাং ও রতন মাংসাংয়ের বিয়ের পর জামাই যাত্রা।

জ্যাষ্ঠ্য ভ্রাতা মিন্টু মাংসাং দুরারোগ্য ব্যাধিতে ধরাশায়ী। অন্য ভ্রাতা হ্যান্ড্রিক মাংসাং পাণি গ্রহন করে সাজান পৃথক ঘর। অভাবী সংসারের ধকল সইতে না পেরে বাবা সুধীর রিছিল অকালে স্বর্গীয় হন। মাতা রিংমির চোখে তখন ঘোর দুর্দিন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিলাস তখন অনেক ছোট। সংসারের এহেন অবস্থায় বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে অাসেন মাধবী। শুরু হয় সাহসী অভিযাত্রা। ভিন্ন রকম গল্প।

জলছত্র কর্পোস খৃস্ট হাই স্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া মাধবী বইকলম ছেড়ে জীবিকার সন্ধ্যানে কনিষ্ঠ ভগ্নী পাঁপড়ির হাত ধরে পাড়ি জমান শহরে। সেই যে নগরে গমণ অার অরণ্যে তেমন করে ফিরে তাকানো হয়নি। সেই যে বিউটিশিয়ানের তকমা প্রাপ্তি সুখেদুখে সেটিই এখন ভরসা। সেটিতেই জড়িয়ে সুখদুঃখের নীরবগাঁথা।

মধুপুর বনাঞ্চলের গারো তরুণীদের বিউটিশিয়ান হওয়ার পশ্চাতে এমন ধারার কাহিনী সর্বত্র বিদ্যমান। বন কমছে, জন ও খানা বাড়ছে, জীবিকা সঙ্কুচিত হচ্ছে, অনিশ্চিত হচ্ছে ভবিষ্যত।

নিত্যনতুন টানাপোড়ন,লেখাপড়ার খরপোষ নেই, পুষ্টিকর খাবারের অনিশ্চয়তা, ঐতিহ্যগত সম্পত্তির সরকারি স্বীকৃতি নেই, ঘরেবাইরে বাঙ্গালী জনবসতির অবিরল চাপ এবং নিজ ভূমে পরবাসী ও প্রান্তজন হওয়ার অাশঙ্কা গারো রমণীদের অরণ্য থেকে নগরমুখীন করছে। গারো নারীরা নৃতাত্বিকভাবেই সাহসী। সেই সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন অচেনাঅজানা নগর গহ্বরে দু’কদম মেলে।

প্রসঙ্গক্রমে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে শোলাকুড়ি, অরনখোলা, বেড়িবাইদ, ফুলবাগচালা ও কুড়াগাছা ইউনিয়ন পাহাড়ী এলাকায় অবস্থিত। এখানে গ্রামের সংখ্যা ১৩৪। এর মধ্যে ৪৪ গ্রামে কমবেশি অাদিবাসী গারো ও কোচরা বসবাস করেন।

এ ৪৪ গ্রামে জনসংখ্যা ৪৯ হাজার ৭২৬ জন। এর মধ্যে অাদিবাসী গারো ১৬ হাজার ৬৪৪ জন। কোচ বা বর্মন ২ হাজার ৬৯৩ জন। এ পাঁচটি ইউনিয়নে শতকরা ৬১.১১% বাঙ্গালী এবং অবশিষ্ট অাদিবাসী গারো ও কোচ জাতিসত্বার মানুষ। খানা হিসাবে বাঙ্গালী ৭ হাজার ৮২৬, গারো ৩ হাজার ২২২ এবং কোচ ৮শত ৩৩।

গারোদের মধ্যে শিক্ষার হার ৭৮.৭৫% হলেও উচ্চ শিক্ষার হার এক্কেবারে নগন্য। মিশনারী প্রাইমারী স্কুলে ফ্রিতে পঞ্চম শ্রেণী পাশের পর দারিদ্র্যতার কষাঘাতে ব্যাপক হারে ঝরে পড়া শুরু হয়।

উচ্চবিদ্যালয়ের গন্ডিতে যাবার পর লেখাপড়ার খরচ চাপলে অধিকাংশই স্কুল ছাড়তে থাকে। দরিদ্র বাবামার মুখে অন্ন তুলে দেবার মানসে মেয়েরা হয়ে পড়ে উৎগ্রীব। অার তখনই শহর তাদের হাত ইশারায় ডাকে। নগরমুখী হবার বাসনা প্রবণতায় রুপ নেয়।

এভাবেই মাধবীরা স্কুল ছাড়ে। বাড়ি ছাড়ে, গ্রাম ছাড়ে। পরিবারের সকলের মুখে হাসির ঝিলিক ফোঁটাতে নগরে অভিবাসী হয়। পড়ালেখায় বড় হবার বাসনা বিসর্জন দেয়। বনের সহজ সরল বৃত্ত ছেড়ে নগরের জটিল অাবর্ত রেখায় প্রবেশ করে। যেখানে অরুপকে রুপ এবং রুপকে অপরুপ করতে গিয়ে নিজেরা অহরহ শ্রম শোষণ, বহুমাত্রার হয়রাণি এবং নিগ্রহের শিকার হন।

মাধবী ২০০৪ সালে প্রথম মিং বিউটি পার্লারে কাজ নেন। বেতন মাত্র পাঁচশত টাকা। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। পার্লারে অাসা বড় বড় মেম সাবদের সাঁজানোর কাজ। গালে ফোঁসকা, অজস্র ব্রণ, কপাল কুঁচকানো। সব পালিশ করে দিতে হবে। স্বামীকে রেখে পার্টিতে যাবেন। বয়ফ্রেন্ডদের সাথে নাচানাচি করবেন। চিত্র নায়িকার মতো গুঁছিয়ে দাও।

চর্মে নিগ্রো কালার। ফেসিয়াল শ্বেতাঙ্গদের মতো করো দাও। এমনি হাজারো সাজে সাঁজানো, রুপবতীকে কমলবতী, বেহায়াকে হাঁয়া রুপদানে পারদর্শী হয়ে উঠেন মাধবী। এখন তিনি অলরাউন্ডার বিউটিশিয়ান।

পৃথিবীর সব পেশার সব কাজের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু বিউটিশিয়ানদের ক্ষেত্রে এর উল্টো।
অভিজ্ঞ বিউটিশিয়ানদের বেশি বেতন দিতে হয় বলে তাদের চাকরি থেকে ছাটাই করা হয়।
হরদম।
মাধবী জানান, মিং থেকে অাসার পর তিনি অানজুশ বিউটি পার্লার, সেখান থেকে একসিলেন্টো পার্লার, তারপর ফ্রিল বিউটি পার্লার, ফ্রিল থেকে এস্তোভা এবং সবর্শেষ উত্তরার অাফসারা পার্লারে কাজ করছেন। কাজের অভিজ্ঞতা ১৬ বছর। বেতন পাচ্ছেন মাত্র বিশ হাজার টাকা। থাকাখাওয়ার পর যৎসামান্য যা থাকে তা মায়ের জন্য পাঠিয়ে দেন।

দীর্ঘ চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, একসিলেন্টা এবং এস্তোভা পার্লারের মালিক তাকে তাকে চরম হয়রানি করেন। কারণ তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম। তাকে বিনা নোটিসে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। তার দুমাসের বেতন অাটকিয়ে দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি থানায় জিডি করতে বাধ্য হন।

মাধবী জানান, তিনি যেসব পার্লারে কাজ করেছেন সবকটি মহিলা বিউটি পার্লার এবং এর মালিক ও ছিলেন মহিলা। কিন্তু শ্রম শোষণ এবং বেতনভাতায় ঠকাতে পুরুষের চেয়ে তারা কম যাননা।
তার ভাষায়, “অামরা এমন একটা জায়গায় চাকরি করি যেখানে রুপ চর্চা হয়, লাবণ্যতাকে তুঁলির অাঁচড়ে ফুঁটিয়ে তোলা হয়, সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটানো হয়,
সুন্দরকে অারো সুন্দরতমে অাদৃত করা হয়, মানুষ যেখানে সেঁজে খুশি হন, সেখানে যারা সাঁজিয়ে, সুন্দরের রুপকার, সৌন্দর্য শিল্পী তারা কেন ঠকবেন, কেন শোষিত হবেন? কেন বিউটিশিয়ানরা ঘন ঘন চাকরি হারাবেন?
কেন বেতন অাটকিয়ে দিয়ে পার্লারে কম বেতনে কাজ করাতে বাধ্য করবেন? কেন মালিকদের অন্যায় কথা না শুনলে নানা অপবাদে পুলিশী হয়রানী করা হবে? কেন তারা সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারবেন না? গার্মেন্টস শিল্প হলে পার্লার কেন শিল্পের মর্যাদা পাবেনা? বিউটিশিয়ানরা বোনাস বা অন্যান্য সুযোগসুবিধা কেন পাবেন না?
এই হাজারো কেন, এর উত্তর শুধু মাধবী নয়, মধুপুরের শতাধিক বিউটিশিয়ান, যাদের সাথে দেখা হয়েছে, নানা মাধ্যমে কথা হয়েছে, তারা জানতে চেয়েছেন।
নগর সভ্যতার দৈহিক সৌন্দর্য চেতনা মানসলোকের কাব্যিক চেতনায় উদ্ভাসিত হোক, মাধবীর মতো অাদিবাসী বিউটিশিয়ান, যারা সুবিধাবঞ্চিত, কষ্টে যাদের জীবন গড়া, বন্ধুর যাদের পথ চলা, তারা সত্যিকার শিল্পীর মর্যাদা পাক, সম্মান পাক, এমন প্রত্যাশা অযৌক্তিক কি?

জয়নাল অাবেদীন
সংবাদকর্মী/ অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।
১৩/০১/২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো সংবাদ
© নাগরিক এক্সপ্রেস । সর্বসত্ব সংরক্ষিত। নাগরিক এক্সপ্রেস এর প্রকাশিত প্রচলিত কোনো সংবাদ তথ্য ছবি আলোকচিত্র রেখা চিত্র ভিডিও চিত্র অডিও কনটেস্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামত এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ণ লেখক এর
Theme Customized By Theme Park BD
error: Content is protected !!