
বিশেষ প্রতিনিধি:
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন আর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য যখন জাতীয় অগ্রাধিকার, তখন দেশের প্রযুক্তি বাজারে বইছে উল্টো হাওয়া। কর বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারের দোহাই দিয়ে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে স্মার্টফোনের দাম। তবে এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সীমিত সংখ্যক আমদানিকারক ও স্থানীয় সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের একছত্র আধিপত্য ও অসাধু বাজার সিন্ডিকেট।
একদিকে উচ্চ করকাঠামো, অন্যদিকে বাজারে গুটিকয়েক নিয়ন্ত্রকের সিন্ডিকেট চক্রের কারণে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এই মাধ্যমটি।
১. যেভাবে কাজ করছে মূল্যবৃদ্ধির ‘সিন্ডিকেট’
দেশের স্মার্টফোন বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি অনুমোদিত আমদানিকারক ও ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে। তাদের কারসাজিতে খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চড়া দাম হাঁকানোর বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়:
* আর্টিফিশিয়াল শর্টেজ বা কৃত্রিম সংকট: জনপ্রিয় ও বাজেট ফ্রেন্ডলি মডেলগুলোর সরবরাহ ইচ্ছে করে কমিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে “স্টক সীমিত” অজুহাতে নির্ধারিত খুচরা মূল্যের (MSRP) চেয়ে ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে ফোন বিক্রি করা হয়।
* দামের সমন্বয়হীনতা: সরকার বা এনবিআর আমদানিতে কোনো শুল্কছাড় দিলে তার সুফল ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছায় না; কিন্তু কর বা আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম সামান্য বাড়লেই দেশে এক লাফেই দাম বাড়ানো হয় কয়েকগুণ।
* এনইআইআর (NEIR) বাস্তবায়নের সুযোগ গ্রহণ: অবৈধ বা ‘গ্রে-মার্কেট’ বন্ধে বিটিআরসির এনইআইআর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট চক্র অফিশিয়াল ফোনের দাম রাতারাতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ক্রেতাদের সামনে কম দামে ফোন কেনার বিকল্প পথও রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
২. স্মার্টফোন বাজারের কর ও মূল্য পরিস্থিতি
দেশের আমদানিকৃত ও স্থানীয়ভাবে সংযোজিত স্মার্টফোনের ওপর শুল্ক ও করের যে বড় পার্থক্য রয়েছে, তার ফায়দা তুলছে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট।
| বিষয় | অবস্থা / পরিসংখ্যান | বাজারের ওপর প্রভাব |
|—|—|—|
| আমদানিকৃত স্মার্টফোনে মোট কর | ৬৪.২৫% পর্যন্ত | ফ্ল্যাগশিপ ও প্রিমিয়াম ফোনের দাম মধ্যবিত্তের সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছে। |
| দেশীয় সংযোজিত ফোনে কর | ১৮% – ২২% | সংযোজনের নামে কিছু যন্ত্রাংশ এনে কম করে অ্যাসেম্বল করলেও সুফল ক্রেতারা পাচ্ছেন না। |
| খুচরা মূল্যে সিন্ডিকেটের প্রভাব | প্রতি সেটে অতিরিক্ত ১০% – ২৫% বৃদ্ধি | আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে স্মার্টফোনের দাম সবথেকে বেশি। |
> মূল্যবৃদ্ধির বাস্তব চিত্র: মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এন্ট্রি ও মিড-রেঞ্জের জনপ্রিয় অনেক ফোনের দাম ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এনবিআর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
>
৩. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব
স্মার্টফোন এখন আর কোনো বিলাসী পণ্য নয়; এটি শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর মূল হাতিয়ার। সিন্ডিকেটের কারণে দাম বৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতিতে যেসব নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে:
* শিক্ষার্থী ও তরুণদের ওপর আঘাত: ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন শিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে যুক্ত তরুণরা বাজেট ফ্রেন্ডলি স্মার্টফোন কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
* ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতি: এফ-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
* গ্রে-মার্কেট বৃদ্ধি ও রাজস্ব হানি: অফিশিয়াল ফোনের চড়া দামের কারণে ক্রেতারা ওয়ারেন্টিহীন ও চোরাই পথের ‘গ্রে-মার্কেট’ ফোনের দিকে ঝুঁকছেন। এতে একদিকে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
৪. সংকট উত্তরণে করণীয়
প্রযুক্তি খাতকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে না পারলে ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ আরও তীব্র হবে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
* প্রতিযোগিতা কমিশনের নজরদারি: আমদানিকারক ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো একজোট হয়ে দাম নির্ধারণ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
* যৌক্তিক শুল্কায়ন ও স্বচ্ছতা: ক্যাটাগরিভিত্তিক খুচরা মূল্যের সর্বোচ্চ সীমা (MRP) স্পষ্ট করে প্যাকেটজাত করা বাধ্যবাধকতা করা।
* উন্মুক্ত আমদানিনীতি: গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে আমদানির একচ্ছত্র অধিকার না রেখে প্রতিযোগিতা বাড়াতে উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
আমদানিকারকদের যুক্তি যাই হোক না কেন, বাজারে কার্যকর তদারকি ও সিন্ডিকেটিং ভাঙার জন্য সরকারি কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া স্মার্টফোনের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
বাজার ঘুরে দেখা যায় যে মোবাইলটি ছিল ৩২৯৯৯ হাজার টাকা বর্তমানে সেই মোবাইলটি বিক্রি হচ্ছে ৩৬৯৯৯ টাকা এরকম করে প্রতিটি মোবাইলের দামি বৃদ্ধি করা হয়েছে ১ হাজার ২৫ হাজার করে